ঢাকা , শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ , ২৭ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

৯/১১ হামলার নেপথ্যে কি মার্কিন সরকার, নাকি অন্য কোনো শক্তি?

ডেস্ক রিপোর্ট
আপলোড সময় : ১১-০৯-২০২৬ ১২:৪৪:৩২ অপরাহ্ন
আপডেট সময় : ১১-০৯-২০২৬ ১২:৪৪:৩২ অপরাহ্ন
৯/১১ হামলার নেপথ্যে কি মার্কিন সরকার, নাকি অন্য কোনো শক্তি? ​ছবি: সংগৃহীত
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর। যুক্তরাষ্ট্রে আর দশটি দিনের মতোই শুরু হয়েছিল সেদিনের সকাল। কিন্তু সকাল ৯টা বাজার আগেই ঘটে যায় আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলা। স্থানীয় সময় সকাল ৮টা ৪৬ মিনিটে নিউইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের নর্থ টাওয়ারে আঘাত হানে একটি বাণিজ্যিক বিমান। এর কিছুক্ষণ পর সাউথ টাওয়ারে আঘাত করে আরেকটি বিমান।

সেদিন যুক্তরাষ্ট্রের চারটি বাণিজ্যিক বিমান ছিনতাই করা হয়। এসব বিমানের নিয়ন্ত্রণ নেয় ১৯ জন ছিনতাইকারী, যাদের আল-কায়েদার সঙ্গে সম্পৃক্ততা ছিল। হামলায় প্রায় ৩ হাজার মানুষ নিহত হন।

ছিনতাই করা বিমানগুলোকে মূলত ক্ষেপণাস্ত্রের মতো ব্যবহার করা হয়েছিল। নিউইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের টুইন টাওয়ারে আঘাত হানা বিমান দুটি ছিল অ্যামেরিকান এয়ারলাইন্স ফ্লাইট ১১ এবং ইউনাইটেড এয়ারলাইন্স ফ্লাইট ১৭৫।

প্রথম বিমানটি নর্থ টাওয়ারে আঘাত করার পর ভবনটিতে ভয়াবহ আগুন ছড়িয়ে পড়ে। প্রায় ১০টা ২৮ মিনিটে নর্থ টাওয়ার ধসে পড়ে। এর আগে সকাল ৯টা ৩ মিনিটে সাউথ টাওয়ারে দ্বিতীয় বিমানটি আঘাত হানে এবং প্রায় ৯টা ৫৯ মিনিটে সেটিও ধসে পড়ে।

তৃতীয় বিমানটি আঘাত করে ওয়াশিংটনের পেন্টাগনে। আর চতুর্থ বিমান ইউনাইটেড এয়ারলাইন্স ফ্লাইট ৯৩ পেনসিলভেনিয়ার শ্যাঙ্কসভিলের কাছে একটি মাঠে বিধ্বস্ত হয়।

ফ্লাইট ৯৩-এর ক্ষেত্রে ধারণা করা হয়, যাত্রীরা ছিনতাইকারীদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন। এর ফলে বিমানটি ছিনতাইকারীদের নির্ধারিত লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছাতে পারেনি। তবে ৯/১১ হামলার পর থেকেই একটি প্রশ্ন বারবার সামনে এসেছে—এত বড় দুটি ভবন কীভাবে ধসে পড়ল? আর এই প্রশ্ন থেকেই জন্ম নেয় নানা ষড়যন্ত্র তত্ত্ব।

বিশেষ করে টুইন টাওয়ারের ধস নিয়ে অনেকের প্রশ্ন ছিল, বিমানের আঘাত ও পরবর্তী আগুন কি সত্যিই এত শক্তিশালী স্টিলের কাঠামোর ভবন ধসিয়ে দিতে পারে?

এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। স্টিল গলে যাওয়া এবং উচ্চ তাপমাত্রায় স্টিলের শক্তি কমে যাওয়া এক বিষয় নয়। ভবনের স্টিলের কাঠামো ধসে পড়ার জন্য স্টিলকে সম্পূর্ণ গলে যাওয়ার প্রয়োজন হয় না। তীব্র তাপে স্টিলের শক্তি ও দৃঢ়তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে।

বিমানের আঘাতে ভবনের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোগত উপাদান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একই সঙ্গে জ্বালানি থেকে সৃষ্ট ভয়াবহ আগুন ভবনের বিভিন্ন অংশের কাঠামোকে আরও দুর্বল করে দেয়। এর ফলে ওপরের অংশের বিশাল ওজন নিচের কাঠামোর ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে। একপর্যায়ে ধস শুরু হলে সেটি ক্রমান্বয়ে নিচের দিকে ছড়িয়ে পড়ে। প্রকৌশলগতভাবে এ ধরনের ঘটনাকে প্রগ্রেসিভ কল্যাপ্স বলা হয়। এরপর আলোচনায় আসে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার ৭ বা ডব্লিউটিসি ৭।

টুইন টাওয়ারের বাইরে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার কমপ্লেক্সের এই ভবনটিও ১১ সেপ্টেম্বর ধসে পড়ে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, কোনো বিমান সরাসরি ডব্লিউটিসি ৭-এ আঘাত করেনি। এই ঘটনাটিই ৯/১১-এর ষড়যন্ত্র তত্ত্বকে আরও জোরালো করার অন্যতম কারণ হয়ে ওঠে।

ষড়যন্ত্র তত্ত্বের প্রবক্তাদের একটি অংশের দাবি, ভবনটির ভেতরে আগে থেকেই বিস্ফোরক স্থাপন করা হয়েছিল এবং পরিকল্পিতভাবে সেটিকে ধ্বংস করা হয়। তাদের মতে, ভবনটি যেভাবে নিচের দিকে ধসে পড়ে, তা অনেকটা কন্ট্রোল্ড ডেমোলিশনের মতো।

কিন্তু সরকারি তদন্তে কী বলা হয়েছিল?

৯/১১ হামলার সামগ্রিক ঘটনা, হামলার পরিকল্পনা, আল-কায়েদার ভূমিকা এবং যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার ব্যর্থতা নিয়ে তদন্ত করে ৯/১১ কমিশন। কমিশনের প্রতিবেদনের মূল সিদ্ধান্ত ছিল, ১১ সেপ্টেম্বরের হামলা আল-কায়েদার পরিকল্পনায় পরিচালিত হয় এবং ১৯ জন ছিনতাইকারী চারটি বিমান ছিনতাই করে হামলা চালায়।

অন্যদিকে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের ভবনগুলোর ধসের প্রকৌশলগত কারণ নিয়ে বিস্তারিত তদন্ত করে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেকনোলজি বা এনআইএসটি।

এনআইএসটির তদন্ত অনুযায়ী, টুইন টাওয়ারে বিমানের আঘাতে কাঠামোগত ক্ষতি হয়। এরপর ছড়িয়ে পড়া আগুন ভবনের স্টিলের কাঠামোকে দুর্বল করে দেয়। এসব ক্ষতির সম্মিলিত প্রভাবে ধসের সূচনা হয় এবং পরে তা নিচের দিকে অগ্রসর হয়।

ডব্লিউটিসি ৭-এর ক্ষেত্রেও এনআইএসটির ব্যাখ্যা ছিল ভিন্ন। সংস্থাটির তদন্ত অনুযায়ী, দীর্ঘ সময় ধরে চলা আগুন ভবনের বিভিন্ন কাঠামোগত অংশকে দুর্বল করে। শেষ পর্যন্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ কলাম ব্যর্থ হওয়ার পর কাঠামোর মধ্যে ধসের ধারাবাহিকতা তৈরি হয় এবং ভবনটি ধসে পড়ে।

তারপরও ৯/১১ নিয়ে ষড়যন্ত্র তত্ত্বের আলোচনা থামেনি। এসব তত্ত্বে সাধারণত কয়েকটি প্রশ্ন বা দাবি সামনে আনা হয়।

প্রথমত, টুইন টাওয়ার ও ডব্লিউটিসি ৭-এর ধসকে কন্ট্রোল্ড ডেমোলিশনের সঙ্গে তুলনা করা হয়। দাবি করা হয়, ভবনগুলোর ধসের ধরন পরিকল্পিত বিস্ফোরণের মতো ছিল।

দ্বিতীয়ত, প্রশ্ন তোলা হয় একটি বাণিজ্যিক বিমান কীভাবে এত বড় ও শক্তিশালী স্টিলের ভবনের ধস ঘটাতে পারে।

তৃতীয়ত, ডব্লিউটিসি ৭-এ কোনো বিমান সরাসরি আঘাত না করার বিষয়টি তুলে ধরে ঘটনাটিকে সন্দেহজনক হিসেবে দেখানো হয়।

চতুর্থত, পেন্টাগনে বিমানের আঘাতে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতির ধরন নিয়েও বিভিন্ন প্রশ্ন ও দাবি সামনে এসেছে। ষড়যন্ত্র তত্ত্বের সমর্থকদের কেউ কেউ মনে করেন, সেখানে যে ধরনের ক্ষতি দেখা যায়, তা বোয়িং ৭৫৭ বিমানের আঘাতের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

এমনকি ষড়যন্ত্র তত্ত্বের একটি অংশে দাবি করা হয়, ৯/১১ হামলার পেছনে মার্কিন সরকার বা অন্য কোনো শক্তির প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষ ভূমিকা ছিল।

তবে এখন পর্যন্ত প্রকাশ্য সরকারি তদন্ত ও প্রকৌশলগত অনুসন্ধানে মার্কিন সরকার পরিকল্পিতভাবে হামলা চালিয়েছে কিংবা ভবনগুলোতে আগে থেকেই বিস্ফোরক বসানো হয়েছিল—এমন দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এনআইএসটিও কন্ট্রোল্ড ডেমোলিশনের ব্যাখ্যাকে সমর্থন করেনি। বিশেষ করে ডব্লিউটিসি ৭-এর ধসকে তারা একটি ধারাবাহিক কাঠামোগত ব্যর্থতার মাধ্যমে ব্যাখ্যা করেছে।

তবে এর অর্থ এই নয় যে ৯/১১ নিয়ে কোনো প্রশ্ন তোলা যাবে না। বরং হামলার আগে ও পরে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা ব্যবস্থার ভূমিকা নিয়ে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের তদন্ত হয়েছে।

কেন হামলার আগে পাওয়া বিভিন্ন গোয়েন্দা তথ্যের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় হয়নি? কেন বিভিন্ন নিরাপত্তা সংস্থার মধ্যে তথ্য আদান-প্রদানে ঘাটতি ছিল? কেন সম্ভাব্য হামলার সতর্কতা থাকা সত্ত্বেও সেটি প্রতিহত করা সম্ভব হয়নি? ছিনতাই হওয়া বিমানগুলোকে কেন সময়মতো থামানো যায়নি?

এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই ৯/১১ কমিশনের তদন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

অর্থাৎ, ৯/১১ নিয়ে দুটি প্রশ্নকে আলাদা করে দেখা জরুরি। একটি হলো—হামলাটি কীভাবে সংঘটিত হয়েছিল? আরেকটি হলো—এত বড় হামলার আগে থাকা সতর্কতা ও গোয়েন্দা তথ্য থাকা সত্ত্বেও কেন যুক্তরাষ্ট্র তা ঠেকাতে পারেনি?

এই দুটি প্রশ্নকে এক করে দেখলে ঘটনাটির প্রকৃত কারণ, তদন্তের ফলাফল এবং পরবর্তী সময়ে তৈরি হওয়া বিভিন্ন ষড়যন্ত্র তত্ত্বের মধ্যে পার্থক্য করা কঠিন হয়ে পড়ে।

বাংলা স্কুপ/ডেস্ক/এইচবি/এসকে


প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স



 

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ